জেনে নিন কোরবানির মাংস সঠিকভাবে সংরক্ষণের কিছু সহজ উপায়

জেনে নিন কোরবানির মাংস সঠিকভাবে সংরক্ষণের কিছু সহজ উপায়

খাদ্য বিজ্ঞানে মাংসকে ফেলা হয় অতি পচনশীল খাদ্যের তালিকায়। অর্থাৎ ঠিকমতো সংরক্ষণ করা না হলে মাংস খুব দ্রুতই নষ্ট হয়ে যায়। পশু জবাইয়ের পর বেশিক্ষণ বাইরে রেখে দিলে মাংসের পেশিগুলো খুব নরম হয়ে যায়। এমনকি মাংসের স্বাদ ও পুষ্টিমূল্য দুটোই নষ্ট হয়ে যায়।

কোরবানির মাংস তিনভাগে ভাগ হয়ে যাবার পর নিজেদের ভাগে যতখানি মাংস রয়ে যায়, সেটা ডিপফ্রিজে সংরক্ষণের জন্যে যেন একদম নাভিশ্বাস উঠে যায় আমাদের। কিন্তু একটুখানি বুদ্ধি করে কোরবানির আগে থেকে একটু গুছিয়ে নেওয়া গেলে কিন্তু কোরবানির মাংস সংরক্ষণ করতে এতো কষ্ট করতে হবে না আপনাকে।

মাংস তাজা ও টাটকা অবস্থায় রান্না করাই সব থেকে ভালো। এতে মাংসের স্বাদ ও পুষ্টিগুণ বজায় থাকে। কোরবানির দিন প্রয়োজন মতো খাওয়ার মাংস রান্না করে বাকিটা সংরক্ষণ করতেই হয়। কিন্তু সেগুলো ফ্রিজে তুলে রাখলেই যে মাংস সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয় এমনটি নয়। আবার যাদের ফ্রিজ নেই, তারা সংরক্ষণ করবেন কীভাবে? ফ্রিজে হোক কিংবা সাধারণভাবেই হোক সঠিক উপায়ে মাংস সংরক্ষণ করা না হলে তা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কাজেই সঠিক উপায়ে মাংস সংরক্ষণের জন্য কিছু পদ্ধতি জানা জরুরি। জেনে নিন কোরবানির মাংস সঠিকভাবে সংরক্ষণের কিছু সহজ পদ্ধতিঃ


চিত্রঃকোরবানির মাংস সঠিকভাবে সংরক্ষণের উপায়। ছবিঃ সংগৃহীত
 মাংস সঠিকভাবে সংরক্ষণের উপায়। ছবিঃ সংগৃহীত 

ফ্রিজে রেখে মাংস সংরক্ষণ

সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হলো ফ্রিজে রেখে মাংস সংরক্ষণ করা। কিন্তু এতেও কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়। এগুলো হলো-
  • প্রথমেই ফ্রিজ ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিতে হবে। কারণ দীর্ঘদিন মাংস সংরক্ষণের জন্য ফ্রিজ পরিষ্কার থাকা খুবই জরুরি। ফ্রিজে আগের মাছ ও মাংসের কারণে গন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
  • ফ্রিজের সব বরফ গলিয়ে রাখা যাবে না। ফ্রিজ পরিষ্কারের পরে ফ্রিজে আবার বরফ জমিয়ে নিতে হবে। এতে মাংস দ্রুত ঠাণ্ডা হবে এবং মান ভালো থাকবে। 
  • পশু জবাইয়ের সাথে সাথেই মাংস ফ্রিজে না রাখাই ভালো।কোরবানির তিন থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত মাংস শক্ত থাকে। এসময়ে মাংস কিছুটা গরমও থাকে। মাংসের তাপমাত্রা স্বাভাবিক হওয়ার পরে ফ্রিজে সংরক্ষণ করা উচিত। 
  • মাংস সংরক্ষণের আগে অবশ্যই ভালোভাবে রক্ত ধুয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে। ধোয়ার পর অতিরিক্ত পানি ঝড়ানোর জন্য বড় ঝুড়িতে রেখে দিতে হবে। মাংস থেকে পানি ঝরে গেলে পলিথিন বা প্লাস্টিকের প্যাকেটে রেখে ভালোভাবে মুখ পেঁচিয়ে বা বন্ধ করে ফ্রিজে রাখতে হবে। 
  • মাংস যদি ধুতে না চান তাহলে পরিষ্কার শুকনা কাপড় দিয়ে মাংসের গায়ে লেগে থাকা রক্ত ভালমতো মুছে নিতে হবে। এবার পলিথিনে করে ফ্রিজে মাংস সংরক্ষণ করুন। 
  • ফ্রিজে রাখার ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে যেন মাংসের টুকরা বেশি বড় না হয়। ছোট ছোট টুকরা করে মাংস সংরক্ষণ করা ভালো। 
  • মাংস সংরক্ষণের জন্য অবশ্যই নতুন ও পরিষ্কার প্যাকেট ব্যবহার করতে হবে। পুরানো বা আগের ব্যবহৃত পলিথিন ব্যবহার করলে মাংস গন্ধ হয়ে যেতে পারে। 
  • মাংস প্যাকেট করে ফ্রিজের ভেতর রাখার সময় দুই প্যাকেটের মধ্যে মোটা কাগজ বা পাতলা কাঠের টুকরা দিতে পারেন। এতে মাংসের প্যাকেট একটার গায়ের সঙ্গে আরেকটা এঁটে যাওয়ার চিন্তা থাকবে না। 
  • ফ্রিজে পুটলি করে মাংস না রেখে যদি বিছিয়ে প্যাকেট করা হয় তবে বেশিদিন সংরক্ষণ করা যায়। 
  • ফ্রিজে মাংস রাখার পর তাপমাত্রা কমিয়ে দিতে হবে। এতে মাংস তাড়াতাড়ি জমবে। 
  • ফ্রিজে গরুর মাংস এবং খাসির মাংস পাঁচ থেকে ছয় মাস পর্যন্ত রেখে খাওয়া যায়। তবে কলিজা বেশিদিন ফ্রিজে না রাখাই ভালো। এতে স্বাদ ও গুন নষ্ট হয়ে যায়। 
  • মাংস ফ্রিজে রাখার আগে মার্কার দিয়ে পলিথিনের প্যাকেটে তারিখ লিখে রাখুন। এতে মাংস কতদিন ধরে ফ্রিজে আছে তা সহজেই বের করতে পারবেন। 
এভাবে সংরক্ষণ করা মাংস অনেকদিন ভালো থাকবে। তবে দীর্ঘদিন ফ্রিজে মাংস রেখে না খাওয়াই ভালো। মাংস টাটকা রান্না করাই শ্রেয়।

ফ্রিজ না থাকলে নিম্নোক্তভাবে মাংস সংরক্ষণ করতে পারেন-

জ্বাল দিয়ে মাংস সংরক্ষণ

মাংস হালকা সিদ্ধ করেও সংরক্ষণ করা যায়, তাতে মাংস আরও ভালো থাকে। মাংস ভালোভাবে ধুয়ে পরিমাণ মতো হলুদ, লবণ মাখিয়ে পানি দিয়ে জ্বাল দিতে হবে। এই মাংস দিনে অন্তত দুবার জ্বাল দিলে দীর্ঘদিন ভালো থাকবে। এভাবে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে মাংসে চর্বির পরিমাণ বেশি থাকলে মাংস অনেকদিন ভালো থাকে।

রোদে শুকিয়ে মাংস সংরক্ষণ

ফ্রিজ ও জ্বাল ছাড়াও রোদে শুকিয়ে মাংস সংরক্ষণ করা যায়। অনেকটা রোদে শুকানো শুঁটকি মাছের মতো এই প্রক্রিয়াটি। এ প্রক্রিয়ায় মাংস শুকিয়ে ফেলার ফলে মাংসে কোনো পানি থাকে না। তাই মাংস দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়।

১। রোদে শুকিয়ে মাংস সংরক্ষণ করতে হলে চর্বি ছাড়া মাংস নিতে হবে। প্রথমে মাংস পরিষ্কার করে ধুয়ে ছোট টুকরা করে নিন। এবার তারে একটার পর একটা মাংস গেঁথে নিন।
২। তারে গাঁথা মাংস ছাদে বা বারান্দায় কাপড় শুকানোর মতো করে টানিয়ে দিন। এছাড়া চুলার উপরে তার বেঁধেও আগুনের তাপে মাংস শুকানো যায়। এই উপায়ে মাংস সংরক্ষণ করলে মাংসের সমস্ত পানি টেনে মাংস একদম শুকিয়ে যায়, ফলে দীর্ঘদিন তা ভালো থাকে।
৩। ছাদে মাংস শুকাতে হলে পাতলা কাপড় বা নেট দিয়ে মাংস ঢেকে দিন। এতে করে ধুলোবালি পড়ে মাংস নোংরা হবে না।
৪। পর পর ৫-৬ দিন মাংস রোদে দিন। মাংস শুকিয়ে একদম শক্ত হলে মুখ বন্ধ করা পাত্রে বা টিনের কৌটায় মাংস ভরে ভালমতো মুখ বন্ধ করে রাখুন। মাঝে মাঝে কৌটা ধরে মাংস রোদে দিন। তাহলে পোকার আক্রমণ হবে না।
৫। রোদে শুকানো মাংস রান্নার আগে হালকা গরম পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। এতে মাংস নরম হবে। তবে রোদ না থাকলে এই পদ্ধতি অনুসরণ না করাই ভালো, কারণ ভালোভাবে না শুকালে মাংস নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

মাংস তেলে সংরক্ষণ 

চিত্রঃতেলে ডুবিয়ে রেখেও মাংস সংরক্ষণ করা যায়
 তেলে ডুবিয়ে রেখেও মাংস সংরক্ষণ করা যায়

মাংস চাকা করে কেটে ভালো করে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নিন। হাঁড়িতে তেল গরম করে তাতে মাংস দিন। এমনভাবে রান্না করুন যেন, মাংস পুরোপুরি সিদ্ধ হয়। খেয়াল রাখতে হবে, সিদ্ধ হওয়ার পর মাংস যাতে তেলে ডুবে থাকে। দুই একদিন পর পর তেলে ডোবানো মাংস গরম করুন। এভাবে প্রায় এক মাস মাংস সংরক্ষণ করা যায়।

এছাড়াও
  • মাংস কেটে পরিষ্কার করে, আদা, রসুন, পেঁয়াজ বেশি করে দিয়ে মেঁখে জ্বাল দিন। একদিন অন্তর জ্বাল দিলে ১৫-২০ দিন মাংস ভালো থাকবে। 
  • মাংস লম্বা লম্বা করে টুকরা করে, লবণ, হলুদ মেখে রেখে রোদে শুকিয়ে নিন। এবার এগুলো তেলে ভেঁজে খেতে পারেন বা রান্নার আগে ভিজিয়ে নিতে পারেন। 
  • আবার ভিনেগার দিয়েও মাংস সংরক্ষণ করা যায়। কোনো টিন বা বোতলে ভিনেগারে মাংস সম্পূর্ণভাবে ডুবিয়ে রাখলে মাংস ভালো থাকে অনেক দিন। 
  • আর ভিনেগার যদি না পাওয়া যায় তাহলে তার বদলে লেবুর রস ব্যবহার করা যেতে পারে। মাংসের টুকরোগুলোকে লেবুর রস দিয়ে মাখিয়ে ক্যানড করলে মাংস ভালো থাকে অনেক দিন। 
  • ভিনেগার বা লেবুর রস ব্যবহার করলে মাংস সংরক্ষণের পাত্রটি ডিপ ফ্রিজে না রেখে রেফ্রিজারেটরে সাধারণ তাপমাত্রায় রাখতে হবে। 
  • মাংস টুকরা কাঁটাচামচ বা ছুরি দিয়ে কেঁচে, এবার লবণ ও লেবুর রসের মিশ্রণে ডুবিয়ে নিন। যাতে ভালোভাবে মিশ্রণ মাংসের ভেতর ঢোকে। এভাবে রাখলে মাংস অনেকদিন ভালো থাকবে।
  • কিছু সলিড মাংস সেদ্ধ করে কাবাবের জন্য রেডি করে রাখা যেতে পারে। 
  • মাংস বড় বড় টুকরো ও কিছু মাংস কুচি করে কিমা হিসেবে সংরক্ষণ করা যায়। 
  • চর্বিযুক্ত মাংস স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, তাই মাংস কাটার সময় চর্বি কেটে নেওয়াই ভালো। 
  • অনেকেই বার বার ঝামেলার ভয়ে রান্না করা মাংস ফ্রিজে রেখে দেন। এক্ষেত্রে রান্না মাংস ছোট ছোট বক্সে রাখুন। প্রত্যেকবার বড় বক্স বের করে গরম করা এবং অল্প একটু খেয়ে বাকিটুকু আবার রেখে দিলে মাংসের স্বাদ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

চর্বি ছাড়া মাংস খেতে টিপসঃ

  • সাধারণত মাংস কাটা হয় কিউব আকারে। এভাবে কাটলে মাংসের মধ্যে চর্বির স্তরগুলো থেকেই যায়। এ জন্য মাংসের টুকরাগুলো স্তরে স্তরে কেটে চর্বির অংশটুকু বাদ দিন। সিনা, রান যে কোনো অংশ থেকেই এভাবে চর্বি বাদ দিয়ে শুধু লাল মাংসটুকু রাখা যেতে পারে। 
  • যাদের কোলেস্টেরলে সমস্যা রয়েছে তারা মাংস প্রথমে সেদ্ধ করে পানিটুকু ফেলে দিন। এরপর ইচ্ছামাফিক রান্না করুন। এতেও চলে যাবে অনেকখানি চর্বি। 
  • গ্রিল করা মাংসে চর্বি প্রায় থাকেই না বলা যায়। রোস্ট বা অন্য কোনোভাবে রান্না না করে তাই গ্রিল খাওয়া অনেক স্বাস্থ্যকর। 
  • সাদা সিরকা, লেবুর রস ও লবণ মাখিয়ে কাঁচা মাংস ভিজিয়ে রাখুন সারা রাত। এভাবে রাখলে মাংসের প্রায় ৮০ শতাংশই চর্বিই চলে যায়। এরপর তা সংরক্ষণ করা যেতে পারে অথবা রান্না করতে পারেন আপনার পছন্দমতো। 

No comments:

Post a Comment

নারকেল তেল দিয়েই দূর করুন খুশকি!

নারকেল তেল দিয়েই দূর করুন খুশকি! নারকেল তেল দিয়েই দূর করুন খুশকি! শীত, গরম বা বর্ষাকালেও খুশকির যন্ত্রনা যেন মেটে না। পার্লারের আহাম...

Our Popular Posts